“হাসিনার এপিএসের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া: অভিযোগ”

Sep 14, 2025 - 14:42
“হাসিনার এপিএসের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া: অভিযোগ”

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস হাফিজুর রহমান লিকুর ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে চাকরি দেওয়া, পুলিশে বদলি করা, এমনকি পৌরসভার নির্বাচনে ইভিএম কারচুপির মাধ্যমে একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা করার নামে অভিনব কৌশলে অন্তত ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অর্জুন সাহা নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

অভিযুক্ত অর্জুন সাহা লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষকলীগের সদস্য ও স্থানীয় আলেকজান্ডার পৌর ৪ নম্বর ওয়ার্ড শাহাপাড়ার বাসিন্দা সুরেশ সাহার ছেলে। জীবিকার তাগিদে এলাকায় একসময় বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে পৌর আলেকজান্ডার বাজারের ফুটপাতে মুড়ির ব্যবসা করতেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, হাফিজুর রহমান লিকুর ঘনিষ্ঠজন এবং জেলা কৃষক লীগের প্রভাবশালী সদস্য পদ কাজে লাগিয়ে এলাকায় ভয়ংকর প্রতারক হয়ে ওঠেন অর্জুন। প্রধানমন্ত্রীর এপিএসের কাছের মানুষ এবং প্রতারণার কৌশল হিসাবে দামী কালো রঙের প্রাডো জিপ নিয়ে ঢাকা থেকে এলাকায় আসতেন তিনি। এলাকায় পরিচয় দিতেন প্রধানমন্ত্রীর এপিএস হাফিজুর রহমান লিকুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তার। বিশ্বাসের জন্য অনেককে ফোনকলে কথা বলাতেন লিকুর সঙ্গে।

যে কারণে রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করা যাবে এমন বিশ্বাসে রামগতির পলাতক পৌর মেয়র এম মেজবাহ উদ্দিন মেজুও তার কাছে ভেড়ান অর্জুনকে। তবে পট পরিবর্তনের পর এলাকায় তেমন একটা দেখা না গেলেও হঠাৎ করে এলাকায় ফিরে আসেন তিনি।

এদিকে, পাঁচ আগস্টের পর এপিএস হাফিজুর রহমান লিকুর আত্মগোপনে তার ব্যবহৃত একটি অফিসের লকার ভেঙে নগদ পৌনে দুই কোটি টাকা লুট ও বিভিন্ন কৌশলে এলাকা থেকে হাতিয়ে নেওয়া টাকা উদ্ধার এবং প্রতারণার বিচার চেয়ে তার বিরুদ্ধে পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর দায়ের করা একটি অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গেল বছর জুলাই আন্দোলন চলাকালে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান তাহেরপুত্র একেএম সালাহ উদ্দিন টিপুকে অস্ত্র ও জনশক্তি দিয়ে সহায়তা করে অর্জুন সাহা। এছাড়া এলাকায় ছাত্রজনতার ওপর নানা ধরনের দমনপীড়নে অংশ নেন তিনি। ওই সময় তার নেতৃত্বে এলাকায় দেশীয় অস্ত্র ও লাঠি মিছিল করে ব্যাপক ত্রাস সৃষ্টি করে তার স্বপক্ষীয় লোকজন।   

পৌর আলেকজান্ডার এলাকার দায়রা বাড়ির বাসিন্দা মঞ্জুর-এ মাওলা তার লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে লিকুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা এবং লিকুর সুপারিশে স্থানীয় প্রশাসনকে দিয়ে একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করার আশ্বাসে প্রতারণার মাধ্যমে অন্তত ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন অর্জুন সাহা।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে চাকরি দেওয়ার নাম করে অসংখ্য লোকের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেন আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত রামগতি পৌর নির্বাচনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার এপিএস-২ হাফিজুর রহমান লিকুর একটি কালো প্রাডো গাড়ি নিয়ে এলাকায় আসেন অর্জুন। একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থীকে লিকুর সুপারিশে কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে জেতানোর প্রলোভনে তাদের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। যে কারণে নির্বাচনের পর টাকা ফেরত চাইলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অনেক নেতাকে দিয়ে হয়রানি করার হুমকি দেন। এভাবেই এলাকায় অসংখ্য লোকের কাছ থেকে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন প্রতারক অর্জুন সাহা।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, পৌর আলেকজান্ডার ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ঝান্টু সাহার কাছ থেকে ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী জামাল উদ্দিনের থেকে ৩ লাখ টাকা, আদালতপাড়া এলাকার জিসানের ভাই পুলিশ সদস্য শিপনকে বদলী করার কথা বলে ৩ লাখ টাকা, ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী বাবলুর কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা, নারী কাউন্সিলর প্রার্থী নুপুর আক্তারের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা, ৫নং ওয়ার্ডের মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থীর স্বামী খোকনের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় অর্জুন। এছাড়াও বিভিন্ন দপ্তরে চাকুরী পাইয়ে দিবে বলে অন্তত দেড় ডজন লোকের কাছ থেকে অন্তত ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় সে। গেল বছরের ৫ আগস্টের পর পলাতক থাকলেও বর্তমানে বাড়িতে এসে পাকা ভবন নির্মাণ করছেন তিনি।

নাম পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধে পৌর ৪নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা তিনজন মধ্যবয়সি নারী জানান, অর্জুনের বাবা সুরেশ সাহা বৃদ্ধ বয়সে আলেকজান্ডার বাজারে বসে ফুটপাতে মুড়ি বিক্রি করেন। অথচ ছেলের কোনো আয়ের উৎস না থাকলেও বাড়িতে পাকা ভবন তৈরি করছেন। ব্যবহার করছেন ৪ লাখ টাকা দামের মোটরসাইকেল।

ভুক্তভোগী সাবেক পৌর কাউন্সিলর প্রার্থী ঝান্টু সাহা জানান, অর্জুন একজন চিহ্নিত প্রতারক। তার রয়েছে বিশাল প্রতারক চক্র। সে আমাকে কাউন্সিলর নির্বাচিত করবে বলে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়েছে। এপিএস লিকুর সাথে ফোনে পরিচয় করে দিয়েছিল। তার কিছু কার্যকলাপ দেখে বিশ্বাস করেছিলাম। পরে বুঝতে পারি সে একজন ভয়ংকর প্রতারক।

ভুক্তভোগী সাবেক পৌর কাউন্সিলর প্রার্থী জামাল উদ্দিন জানান, অর্জুন আমাকে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করার কথা বলে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছে। নির্বাচনের পর আমি তাকে আটক করলে ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেয়। বাকি টাকা ১ মাসের মধ্যে ফেরত দেবে মর্মে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পায়।

অভিযুক্ত অর্জুন সাহা অখ্যাত একটি ওষুধ কোম্পানির মালিক পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস লিকুর লকার ভেঙ্গে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সত্য নয়। তিনি নিজেকে সহজ সরল মানুষ বলে দাবি করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস হাফিজুর রহমান লিকুর সঙ্গে যোগাযোগে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

রামগতি থানার ওসি মো. কবির হোসেন জানান, এ ধরনের অভিযোগ আমরাও শুনছি।  লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।