প্রাইমারি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ: ইসলামী দলগুলোর নীরবতা ও জাতির ভবিষ্যৎ সংকট।

Aug 29, 2025 - 17:42
প্রাইমারি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ: ইসলামী দলগুলোর নীরবতা ও জাতির ভবিষ্যৎ সংকট।
1 / 1

1. প্রাইমারি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ: ইসলামী দলগুলোর নীরবতা ও জাতির ভবিষ্যৎ সংকট।

মাওলানা রেজাউল করিম নওগাঁ 
 জেলা প্রতিনিধি,,, 

বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। স্বাধীনতার পর থেকে সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী শিক্ষাকে প্রয়োজনীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি। বিশেষত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষকের পদ সৃষ্টি না হওয়া জাতীয় জীবনের জন্য গভীর উদ্বেগজনক একটি সংকেত। সঙ্গীত, শারীরিক শিক্ষা বা অন্য যেকোনো সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্য পদ সৃষ্ট হলেও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অবহেলা প্রকাশ করে সরকার বারবার মুসলিম জাতিসত্তার ভিত্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

ধর্মীয় শিক্ষার বাস্তব প্রেক্ষাপট

১. সংবিধান ও রাষ্ট্রধর্মের বৈপরীত্য
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা থাকলেও, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আলাদা ধর্মীয় শিক্ষকের পদ না থাকা এ ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২. শিক্ষার্থীদের চাহিদা
বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবার ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অনুরাগী। তারা সন্তানদের নৈতিকতা, চারিত্রিক গঠন ও ধর্মীয় জ্ঞানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি আলাদা কওমি বা মক্তবে পাঠাতে বাধ্য হয়। অথচ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমেই এ মৌলিক শিক্ষাটি নিশ্চিত করার কথা।

৩. আন্তর্জাতিক উদাহরণ
পাশ্চাত্য ও অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোতেও ধর্মীয় শিক্ষা (Religious Studies / Ethics Education) প্রাথমিক স্তরে পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে থাকে। অথচ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে তা উপেক্ষিত হওয়া দুঃখজনক।

ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

দেশের জনগণ আশা করে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো ইসলামী শিক্ষার প্রশ্নে সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের অবস্থান ছিল প্রায় নীরব বা প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।

কোনো বৃহৎ আন্দোলন নেই: রাজপথে বা সংসদে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি নিয়ে বড় কোনো আন্দোলন দেখা যায়নি।

বিভক্তি ও দলীয় স্বার্থ: ইসলামী দলগুলো বিভক্ত এবং একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখায়; ফলে ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় দাবিতে এগিয়ে আসতে পারেনি।

জনমত সৃষ্টির ব্যর্থতা: মিডিয়াতে কার্যকর প্রচারণা চালিয়ে এই ইস্যুকে জাতীয় আলোচনায় পরিণত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের গুরুত্ব

১. নৈতিকতা ও চারিত্রিক উন্নয়ন
ধর্মীয় শিক্ষার অভাব নৈতিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই আল্লাহভীতি, সততা, মানবিকতা ও নৈতিকতা শিখে, তবে সমাজে অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাবে।

২. জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতি রক্ষা
বাংলাদেশি মুসলিম সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় চেতনা। প্রাথমিক পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষকের অভাব জাতীয় পরিচয়কে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলছে।

৩. শিক্ষাক্ষেত্রে ভারসাম্য
সঙ্গীত, চারু ও শারীরিক শিক্ষার পদ থাকলেও ধর্মীয় শিক্ষকের পদ না থাকা শিক্ষাক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈষম্য।
অধিকাংশ প্রাইমারি স্কুলে ইসলাম ধর্ম শিক্ষা দেয় হিন্দু শিক্ষক। যে শিক্ষক নিজে অগ্নি উপাসনা করে, মূর্তি পূজা করে সে কিভাবে ইসলাম ধর্মের শিক্ষা দিবে? 

উপসংহার ও সুপারিশ

বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষকের পদ সৃষ্টি না হওয়া কেবল শিক্ষাগত বৈষম্য নয়, বরং মুসলিম জাতিসত্তাকে দুর্বল করার একটি কৌশল। সরকারের পাশাপাশি ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোরও এই ব্যর্থতার দায় এড়ানো সম্ভব নয়। কারণ তারা জনগণের আস্থা অর্জন করেও এই মৌলিক ইস্যুকে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তাই এখন প্রয়োজন—

ইসলামী দলগুলোর বিভক্তি দূর করে এক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

সংসদ, রাজপথ ও মিডিয়াতে একযোগে এই দাবিকে উত্থাপন করা।

সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা।

মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় শিক্ষা থেকে প্রজন্মকে বঞ্চিত করা মানেই একটি জাতিকে ভবিষ্যতে নৈতিক দেউলিয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া। ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো যদি এ বিষয়েও কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে কেবল সরকার নয়—তারাও ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে।

---
প্রভাষক মাওলানা রেজাউল করিম নওগাঁ 
আরবি প্রভাষক,ধর্মপুর গোয়ালভিটা  হোসেনিয়া আলিম মাদ্রাসা, বদলগাছী, নওগাঁ।