হারিয়ে যেতে বসেছে ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্প

Sep 18, 2025 - 19:36
হারিয়ে যেতে বসেছে ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্প

জামালপুর প্রতিনিধি:
জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার উত্তর দরিয়াবাদ কাঁসারীপাড়া একসময় দেশের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্পের জন্য খ্যাত ছিল। এই শিল্পের সুনাম শুধু দেশে নয়, বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বিয়ে-সাদি, আকিকা ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে কাঁসার তৈরি সামগ্রী ছিল অপরিহার্য। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোর কাছে কাঁসার জিনিসপত্র ছিল অন্যতম প্রিয় পণ্য।

ব্যবসায়ীদের ভিড়ে একসময় ইসলামপুরের কারখানাগুলোতে দিনরাত কাজ করেও চাহিদা মেটানো যেত না। জানা যায়, ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে লন্ডনের বার্মিংহাম শহরে আয়োজিত আন্তর্জাতিক হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে ইসলামপুরের কাঁসা শিল্পী প্রয়াত জগৎচন্দ্র কর্মকার অংশ নেন। সেখানে প্রদর্শিত কাঁসা শিল্প স্বর্ণপদক অর্জন করে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করে।

ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে কাঁসা শিল্পের সূচনা বহু প্রাচীন কালে। কেউ কেউ একে রামায়ণ-মহাভারতের যুগের শিল্প বলেও মনে করেন। ঢাকার ধামরাই অঞ্চল থেকেই এই শিল্পের বিস্তার ঘটে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে কাঁসারীপাড়া নামে পরিচিত কারখানাভিত্তিক বসতি গড়ে ওঠে।

একসময় কাঁসার তৈরি জিনিসপত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় হিসেবে ব্যবহার করা হলেও টিন, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের প্রচলন এবং উচ্চমূল্যের কারণে এ শিল্প ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারায়। ফলে অনেক কারিগর বিকল্প জীবিকার সন্ধানে অন্য পেশায় চলে যান।

বর্তমানে নানা সংকট সত্ত্বেও ইসলামপুরে এখনও ৭–৮টি প্রতিষ্ঠান কাঁসা শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। তবে শিল্পের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিকদের বেতন প্রদানে সমস্যা ও বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় এ শিল্প আজ টিকে থাকার লড়াই করছে।

কাঁসা শিল্প মালিক উত্তম কর্মকার বলেন, “উত্তরসূরী হিসেবে এই শিল্প কারখানাটি পেয়েছি। কিন্তু কালের বিবর্তনে এটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একে বাঁচাতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা জরুরি।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান বলেন, “আমরা চাই না এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাক। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়নে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরদের তালিকা প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐতিহ্যবাহী এ কাঁসা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক ঋণ সুবিধা, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি ও সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এখন সময়ের দাবি। ইতোমধ্যেই ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও), পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং উন্নয়ন সংঘ ইউএসসহ কয়েকটি সংস্থা এ শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে কাজ করছে।