চব্বিশের ২৪ টুকরো
সবকিছু ছাপিয়ে জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বদলে দিয়েছে বাংলাদেশকে।
ইতিহাসের খেরোখাতায় ২০২৪ চিহ্নিত হয়ে থাকবে আরো একটি বাঁক বদলের বছর হিসেবে, অগ্নিগর্ভ যে বছরে বাংলাদেশ যাত্রা করেছে নতুন গন্তব্যের পথে।
শুরুটা হয়েছিল আরো একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দিয়ে, সময় যত গড়িয়েছে, চেনা অচেনা ঘটনা-দুর্ঘটনায় নিজের রূপ স্পষ্ট করেছে ২০২৪।
বছরের শেষে এসে ভুগিয়েছে ডেঙ্গু, কিন্তু জিনিসপত্রের লাগামহীন দাম ভুগিয়েছে সারা বছর।
হানা দিয়েছে নজিরবিহীন বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ; আবার অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে বহু প্রাণ।
সবকিছু ছাপিয়ে জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বদলে দিয়েছে বাংলাদেশকে। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের প্রশ্নবিদ্ধ শাসনের অবসান ঘটেছে, ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের শাসক শেখ হাসিনা।
বলা হচ্ছে এটা ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’, বলা হচ্ছে এটা ‘নতুন বাংলাদেশ’। খোল নলচে পাল্টে সেই নতুন বাংলাদেশকে আকৃতি দিতে চলছে সংস্কারের মহাযজ্ঞ।
অস্থির এ সময় পেরিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় পৌঁছাতে যে নির্বাচন দরকার, তার সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে পারেনি ২০২৪। তবে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ধারণা দিয়েছে, ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে হতে পারে কাঙ্ক্ষিত সেই নির্বাচন।
তার আগে নতুন বছরেও বাংলাদেশের সঙ্গী হবে অর্থনীতির ভগ্নদশা। বাজার দরের সঙ্গে জীবনকে মানিয়ে নেওয়ার আপস করতে করতেই ২০২৫ সালকে স্বাগত জানাবে আশায় বুক বাঁধা বাংলাদেশ।
‘ডামি আর আমি’
টানা তিন মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার মধ্যে ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে আওয়ামী লীগ সরকার। এ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর শেখ হাসিনা টানা চতুর্থবারের মত সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার শঙ্কা ছিল শুরু থেকেই। আওয়ামী লীগের আরেকটি সাজানো নির্বাচনের প্রক্রিয়ার মধ্যে বিএনপিসহ ২৬টি দল ভোট বর্জন করে। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ২৮টি দল নির্বাচনে অংশ নেয়।
ভোট অংশগ্রহণমূলক দেখাতে ‘ডামি’ প্রার্থীদের জন্য পথ খুলে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়নের বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থীরা দাঁড়িয়ে যান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। অধিকাংশ আসনে ভোট হয় আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের। অনেকে বলতে শুরু করেন, এটা আওয়ামী লীগের ‘ডামি আর আমি’ নির্বাচন।

সব মিলিয়ে ভোটার উপস্থিতির কম হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। ৭ জানুয়ারি দিন শেষে ৪০% ভোটার উপস্থিতির তথ্য জানানোর পর নির্বাচন কমিশনকেও তোপের মুখে পড়তে হয়। ২৯৮ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২২, জাতীয় পার্টি ১১, স্বতন্ত্র ৬২, জাসদ ১টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও কল্যাণ পার্টি ১টি আসন পায়।
৭ জানুয়ারির ভোটে জিতে শেখ হাসিনা টানা চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড গড়েন। আগের তিন মেয়াদে সব আন্দোলন দমিয়ে দিতে পারলেও জুলাই-অগাস্টের গণ অভ্যুত্থানে তার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
৩৬ জুলাইয়ের উপাখ্যান
আন্দোলনের শুরুটা ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল বা সংস্কারের দাবিতে। সেদিন ছিল ১ জুলাই, আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এরপর ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক মন্তব্যে আগুনে যেন ঘি পড়ে। তিনি বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি পুতিরা পাবে না তাহলে কি রাজাকারের নাতি পুতিরা (চাকরির কোটা) পাবে?”
ওইদিন গভীর রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে মিছিল বের হয়। সেখানে স্লোগান ওঠে, ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার-রাজাকার’। এরপর থেকে সহিংস হয়ে ওঠে পরিস্থিতি।
আন্দোলন দমাতে আলোচনার পথে না গিয়ে সরাসরি ‘গুলি’, ডিবি অফিসে ধরে এনে নির্যাতনের মত বিষয়গুলো ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দেয় দেশজুড়ে। একদিকে রক্ত ঝরতে থাকে রাজপথে, আরেকদিকে আন্দোলনে জমায়েত বড় হতে থাকে।
পরিস্থিতি সামলানো যাচ্ছে না দেখে আলোচনার প্রস্তাব দেয় সরকার। আন্দোলনকারীরা তাতে সাড়া না দিলে সহিংসতা মারাত্মক রূপ পায়। জারি করা হয় কারফিউ, মাঠে নামে সেনাবাহিনী। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট।
কিন্তু তাতে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো দেশ। কোটা সংস্কারের আন্দোলন পরিণত হয় শেখ হাসিনার পতনের ১ দফার আন্দোলনে।
শেখ হাসিনার পতনের আগের দিনও চোটপাট দেখিয়ে গেছে আওয়ামী লীগ। দলটির অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ঘুণাক্ষরেও ধারণা করতে পারেননি, তাদের পতন আসন্ন।
৫ অগাস্ট ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঢাকামুখী রোডমার্চ। সেদিন সকালেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মাঠে নেমে পুলিশের সঙ্গে মিলে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারী ওপর হামলা ও গুলি চালায়।
উত্তরায় সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের পথ ছেড়ে দিলে শেখ হাসিনার সরকারের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। ঢাকার পথে পথে শুরু হয় জনস্রোত। তার মধ্যেই খবর আসে, পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন ১৫ বছরের শাসক শেখ হাসিনা, তার গন্তব্য ভারত।
উন্মত্ত জনতা গণভবনের দখল নেয়, চলে ভাংচুর, লুটপাট। সংসদ ভবনেও দেখা যায় একই চিত্র। ফিরে আসে কলম্বোর গণ অভ্যুত্থানের স্মৃতি।
ছাত্ররা বলেছিল জুলাই মাসেই শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করবে তারা। ৩১ জুলাইয়ের পর থেকে তারা নতুন হিসাব শুরু করে। ৫ অগাস্ট হল সেই ৩৬ জুলাই।
সবচেয়ে বেশি দিনের শাসক, এখন ফেরারি আসামি
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ফেরেন ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। এরপর দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ চালিয়েছেন টানা সাড়ে পনের বছর। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নিজের অধীনেই একের পর এক নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে গেছেন। সবশেষ ২০২৪ এর জানুয়ারিতে টানা চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হয়ে সরকার গঠন করেন।
বাংলাদেশে সবচেয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় সরকারের ভেতর-বাইরে তৈরি হয় তার একচ্ছত্র আধিপত্য। তার বক্তব্যেও তার ছাপ পড়ে।
২০২২ সালের অগাস্টে ‘পলায়নের মনোবৃত্তি আওয়ামী লীগের নেই বলে’ মন্তব্য করে বিএনপির উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে তিনি বলেন, ‘ভোট চুরির’ কারণে দুইবার যাদের নির্বাচন বাতিল হয়েছে, তাদের মুখে ‘এত লম্বা কথা’ আসে কীভাবে?
আওয়ামী লীগ সভাপতি সেদিন বলেন, “বিরোধী দল সংসদে না থাকলেও তারা বক্তব্য দেয়- আমাদের নাকি পালানোর কোনো পথ থাকবে না। আমি এমন বক্তব্যদাতাদের উদ্দেশে বলতে চাই- শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ কখনও পালায় না।”
একইরকমভাবে তিনি নিজের অবস্থান ফের জানান দেন চলতি বছরের জুলাইয়ের আন্দোলনে। তার ‘পালিয়ে যাওয়ার’ সম্ভাবনা নিয়ে বিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা পালায় না। আমার ফ্রান্সে যাওয়ার কথা, ব্রাজিলের যাওয়ার কথা, আমি ক্যানসেল করে দিয়েছি।”
বারবার ‘শেখ হাসিনা পালায় না’ বলে দম্ভোক্তির মধ্যেই প্রবল আন্দোলনে ক্ষমতা ছেড়ে শেখ হাসিনাকে পালাতে হয়েছে ভারতে। বাংলাদেশ সরকার তার লাল পাসপোর্ট বাতিল করেছে, অন্যদিকে ভারত সরকার তাকে ট্রাভেল ডকুমেন্ট দিলেও ভারতের বাইরে অন্য কোনো দেশে যাওয়া তার জন্য সহজ নয়।
স্বাধীনভাবে থাকার জন্য তার বিকল্প ছিল যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়। ওই দরজা সম্ভবত বন্ধ থাকায় দিল্লিতেই বাস করছেন তিনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির লুটিনস বাংলো জোনের একটি সুরক্ষিত বাড়িতে থাকছেন শেখ হাসিনা। ভারত সরকারই ওই বাড়িতে তার থাকার বন্দোবস্ত করেছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রমের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে এ সময়ে তার সরকারের বিরুদ্ধে ‘স্বৈরাচারী’ শাসন, বিরোধীদের দমন এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। হত্যা ও গুমের মামলাও হচ্ছে এখন।
ক্ষমতার পালাবদলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এখন ফেরারি আসামি। ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ ও ‘গণহত্যার’ অভিযোগে তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকও তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে।
সরকার পতনের পর এক মাসেই বিগত সরকারের মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে প্রায় পৌনে তিনশ মামলা হয়েছে। এসব মামলায় নাম প্রকাশ করে আসামি করা হয়েছে ২৬ হাজারের বেশি মানুষকে; অজ্ঞাতপরিচয় আসামি রয়েছে দেড় লাখের ওপরে।
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর বিমানবন্দরে তার একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
ক্ষমতা হারিয়ে আওয়ামী লীগ কার্যত ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে। দলের অনেক নেতা কারাগারে, অনেকেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন। বিদেশে কারও কারও উপস্থিতি মিলছে। ভার্চুয়ালিও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যুক্ত হওয়ার খবর মিলছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির মুখে ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী’ কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদকে বলতে হয়েছে, দেশের ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে’ প্রয়োজন হলে বিএনপির সঙ্গে একযোগে কাজ করতেও তার দল প্রস্তুত।
জানুয়ারিতে দণ্ডিত আসামি, অগাস্টে রাষ্ট্রক্ষমতায়
শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২৪ সালের প্রথম দিনই মিলেছিল আদালতের ছয় মাসের দণ্ডাদেশ। কিন্তু মাত্র দুইশ বিশ দিনের ব্যবধানে দেশের হাল ধরতে প্যারিস থেকে ফিরলেন ঢাকায়। একজন শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ আর ‘গরিবের ব্যাংকার’ হয়ে শান্তিতে নোবেলজয়ীর পরিচয়ের পর নতুন এক পরিচয় পেলেন মুহাম্মদ ইউনূস। শপথ নিলেন বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে।
ছাত্র জনতার প্রবল গণ আন্দোলনে ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুহাম্মদ ইউনূসকে বিমানবন্দরে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় অর্ভ্যথনা।
সরকার পরিচালনার অংশ হওয়ার অভিজ্ঞতা ইউনূসের আগেও রয়েছে। ১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা সঙ্গী করে গত সাড়ে চার মাস ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশ পরিচালনায়।
আদালতের কাঠগড়ায় খাঁচাবন্দি থাকার দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথাও সাংবাদিকদের বলেছিলেন ইউনূস।
ক্ষুদ্রঋণের ধারণাকে বিশ্বে জনপ্রিয় করে তোলা মুহাম্মদ ইউনূস এবং বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে তার হাত দিয়ে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংককে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।
শান্তিতে নোবেল জয়ের পর বিশ্বজুড়ে দেশের সুনাম কুড়িয়ে আনা এ ব্যক্তিত্বকে কদিন আগেও কিছুদিন পর হাজির হতে হয়েছে আদালতের প্রাঙ্গণে। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে শ্রম আদালত ইউনূসসহ গ্রামীণ টেলিকমের চার কর্মকর্তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়।
এরপর ৪ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তিনি পরিহাসের ছলে বলেন, “আজকের এ ছবিটা আপনারা তুলে রাখুন। দুর্নীতি দমন কমিশন ও বটতলার এটি একটি ঐতিহাসিক ছবি হয়ে থাকবে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এটি প্রকাশিত হবে। যুগ যুগ ধরে নানান বইতেও এটা প্রকাশিত হবে। আপনারা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবেন।”
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন একসময় প্রবল গণআন্দোলনে পরিণত হয়। ব্যাপক সহিংসতা ও গণদাবির মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পদত্যাগ করে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান।
এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করলে তাতে সম্মতি দেন রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধানসহ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। রাজনীতিতে আসার অভিপ্রায় না থাকলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকার প্রধান হতে তিনি সম্মতি দেন।
৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে শপথ নেন মুহাম্মদ ইউনূস
সেই সময়ের কথা তুলে ধরে অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এনপিআরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউনূস বলেন, “ঘটনাপ্রবাহের অদ্ভূত পালাবদল। আমি প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ নেওয়ার আগে প্যারিসে ছিলাম। বোঝার চেষ্টা করছিলাম, আমি যদি ফিরে যাই, আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, কারণ তিনি (শেখ হাসিনা) আমার ওপর ক্রোধান্বিত হবেন এবং আমাকে জেলে পাঠাবেন। তাই ভাবছিলাম ফিরতে দেরি করব কি না।
“হঠাৎ বাংলাদেশ থেকে একটা ফোন পেলাম যে, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) দেশ ছেড়েছেন। আমরা চাই আপনি সরকারপ্রধান হন।’ এটা ছিল একটা বড় চমক।”
রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার আগে সব মামলায় আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। একাধিকবার তিনি বলেছেন, রাজনীতিতে যোগদান বা ভোট করার কোনো ইচ্ছা তার নেই। বাংলাদেশে ‘নতুন বাংলাদেশে’ পরিণত করতে সংস্কার কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টাই তিনি করে যাচ্ছেন।
অবশেষে মুক্তি
বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী তিনি, অন্যতম বড় রাজনৈতিক দলের চার দশকের নেতা। আওয়ামী লীগের সময়ে দুর্নীতির মামলায় তাকে পাঠানো হয়েছিল কারাগারে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান মুক্তি এনে দিয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের সাজা দিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই বছরের অক্টোবরে হাই কোর্টে আপিল শুনানি শেষে সাজা বেড়ে হয় ১০ বছর। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও আরও সাত বছরের সাজা হয় তার।
দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর পরিবারের আবেদনে ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে তাকে সাময়িক মুক্তি দেয়। ওই বছরের ২৫ মার্চ গুলশানের বাসা ফিরোজায় ফেরেন খালেদা। কিন্তু তিন শর্তের পাকে পরের চারটি বছর তার জীবন আবদ্ধ থাকে ওই বাসায় আর হাসপাতালের মধ্যে।
সরকার পতনের পর ৭ অগাস্ট বিএনপির সমাবেশে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভাষণ দেন খালেদা জিয়া।
২১ নভেম্বর সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পরদিনই রাষ্ট্রপতির আদেশে দণ্ড মওকুফ করে খালেদা জিয়াকে ‘পুরোপুরি’ মুক্তি দেওয়া হয়। পরে এক মামলায় তিনি উচ্চ আদালত থেকেও খালাস পান। অন্য মামলার ক্ষেত্রেও একই রায় আসবে বলে আশায় আছেন বিএনপি নেতারা।
গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যান বিএনপি চেয়ারপারসন। ছয় বছর পর প্রকাশ্যে কোনো অনুষ্ঠানে দেখা যায় তাকে।
আগামী ২১ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে খালেদা জিয়ার। সেক্ষেত্রে অর্ধযুগ পর প্রথম কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সশরীরে দেখা যাবে তাকে।
দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, ফুসফুস, কিডনি, ডায়াবেটিসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন ৭৯ বয়সী সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী; চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ারও প্রস্তুতি চলছে। যুক্তরাজ্য হয়ে তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা, তবে সেই দিন তারিখ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
চাপে চুপ্পু
গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই রাতেই বঙ্গভবনে বিএনপি, জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকে বসেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
এরপর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের বিলুপ্ত ঘোষণা করেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার আভাসও দেন।
ওই ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেন,”প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি।”
পরদিন বঙ্গভবন থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও সংসদ বিলুপ্ত করার কথা জানানো হয়। আগের দিনের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দণ্ড মওকুফ করে ‘মুক্তি’ দেওয়া হয়।
সরকারপতনের পর ২১ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে প্রথমবারের মত বঙ্গভবনের বাইরে দেখা যায়। সশস্ত্র বাহিনী দিবসে শিখা অনির্বাণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে ২২ অক্টোবর বঙ্গভবনের বাইরে দিনভর বিক্ষোভ হয়।
প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বত্র আওয়ামী শাসনের চিহ্ন মুছে ফেলার কাজ জোরেশোরে চললেও সাংবিধানিক প্রয়োজনে টিকে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। কিন্তু আড়াই মাস পর দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে তারও বিদায় ঘণ্টা বাজার উপক্রম হয়।
সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। ওই বক্তব্য দিয়ে তিনি ‘শপথ ভঙ্গ করেছেন’ দাবি করে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, এরপরও তাকে রাষ্ট্রপতি পদে রাখা চলে কি না, তা বিবেচনার সুযোগ সংবিধানে আছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা অক্টোবরের শুরু থেকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি করে আসছিলেন। রাষ্ট্রপতির মন্তব্যের পর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও এ ধরনের কথা বলতে শুরু করেন।
এ নিয়ে উপদেষ্টা পরিষতের বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ আরও কয়েকটি সংগঠন রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে বঙ্গভবনের সামনে গভীর রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ করে।
সবাই ধরেই নিয়েছিল, রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর সময় বুঝি শেষ। নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন সে জল্পনা কল্পনাও শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নিয়ে ‘সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক সংকট’ এড়ানোর পরামর্শ দেয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে টিকে যান মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।
কবে ফিরবেন?
আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর থেকে আরও একটি প্রশ্ন বার বার ঘুরেফিরে আসছে– বিএনপি নেতা তারেক রহমান দেশে ফিরবেন কবে?
বিএনপি নেতারা উত্তরে বলছেন, তিনি ফিরবেন ‘সময় হলেই’। সেই সময়টা কবে, কেউ বলছেন না। তবে তারেক যাতে নির্বিঘ্নে ফিরতে পারেন, তার ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে।
জরুরি অবস্থার সময় ২০০৮ সালে সপরিবারে লন্ডনে যাওয়ার পর থেকে সেখানে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে পাঁচটি মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে।
সরকারপতনের পর ৭ অগাস্ট ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নয়া পল্টনে বিএনপির সমাবেশে বক্তৃতা দেন তারেক রহমান।
এর মধ্যে ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় তাকে দেওয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আপিল করার সুযোগ না পেলেও হাই কোর্ট তাকে এবং দণ্ডিত সব আসামিকে খালাস দিয়েছে। বিভিন্ন আদালতে আরো কয়েকটি মামলায় তারেকের খালাসের রায় এসেছে।
১২ ডিসেম্বর লন্ডন ঘুরে এসে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “উনার বিরুদ্ধে আপনারা জানেন অনেক মিথ্যা প্রতিহিংসামূলক মামলা রয়েছে। সেগুলো প্রত্যাহার হলে বা আদালতের মাধ্যমে শেষ হলে তিনি ফিরবেন।”
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ১০ বছরের সাজা, অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় ৯ বছরের সাজা, বিদেশে অর্থপাচার মামলায় ৭ বছরের সাজা এবং বঙ্গবন্ধুকে ‘কটূক্তির’ অভিযোগে দুই বছরের সাজা হয়েছিল তারেকের। সেসব মামলাতেও তিনি খালাস পাবেন বলে আশা করছে বিএনপি।
নিষিদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞামুক্ত
জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন যাদের ভাগ্য সবচেয়ে বেশি বদলে গিয়েছে, নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে সামনের কাতারে আছে জামায়াতে ইসলামী।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে দলের শীর্ষ নেতাদের। আদালতের রায়ে হারাতে হয়েছে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন। মামলায় মামলায় নেতাকর্মীদের থাকতে হয়েছে দৌড়ে ওপর। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে এমনই ছিল জামায়াতে ইসলামীর দশা।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সেই আন্দোলনের সহিংসতার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী জামায়াত এবং এর সকল অঙ্গ সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী সত্তা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাত্র চার দিন আগে তড়িঘড়ি করে জারি করা ওই নিষেধাজ্ঞা চার সপ্তাহও টেকেনি।
জামায়াতে ইসলামী নিষেদ্ধের সেই প্রজ্ঞাপন
বিজয় দিবসে ঢাকার শাহবাগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিজয় মিছিল।
পট পরিবর্তনের পর ২৮ অগাস্ট নিষেধাজ্ঞার সেই আদেশ প্রত্যাহার করে নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী, এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বা এর কোনো অঙ্গ সংগঠনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও সহিংসতায় সম্পৃক্ততার ‘সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রমাণ’ সরকার পায়নি।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো বৈঠকে এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকছে জামায়াত। আওয়ামী লীগ শাসনামলে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে তাদের সম্মেলন না হলেও পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়মিত চলছে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন ফিরে পেতে জামায়াতে ইসলামীর যে আপিল আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক বছর আগে খারিজ করে দিয়েছিল, গত ২০ অক্টোবর তা পুনরুজ্জীবিত করার আদেশ দেয় সর্বোচ্চ আদালত। আদালতের রায় পক্ষে পেলে দলীয় পরিচয়ে জামায়াত নেতাদের প্রার্থী হতে আর কোনো বাধা থাকবে না।
ফাঁটা বাঁশে জাপা
জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মঞ্চস্থ হয় জাতীয় পার্টির নতুন নাটক। নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা না নেওয়া এবং দলের কর্তৃত্ব নিয়ে দেবর-ভাবির মতবিরোধ নতুন করে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং ছেলে রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে দূরে থাকেন। আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপস করে আরো এক মেয়াদ সংসদের বিরোধী দল হওয়ার আশায় নির্বাচনে অংশ নেন এরশাদের ভাই, পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের অনুসারীরা।
শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি পায় ১১টি আসন। কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দিষ্ট কয়েকটি আসন ছাড়া বাকিগুলোতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের কাছে হেরে যাওয়ার পর জাতীয় পার্টি দুই ভাগ হয়ে কর্মসূচিও ঘোষণা করে। দুই গ্রুপই নিজেদের জাতীয় পার্টি দাবি করে কেন্দ্রীয় অফিস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কার্যালয় ভাঙচুর করে।
গত ৩১ অক্টোবর ঢাকার বিজয়নগরে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা হয়।
১ নভেম্বর জাতীয় পার্টির এক সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে জিএম কাদের মন্ত্রীর মর্যাদায় বিরোধী দলীয় নেতা হন। কিন্তু ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের গতন ঘটলে সংসদও ভেঙে দেওয়া হয়। জাতীয় পার্টি পড়ে অন্য রকম ঝামেলায়।
গত তিন নির্বাচনে অংশগ্রহণ, মন্ত্রী হওয়া ও বিরোধী দলে থেকেও আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দিয়ে রাজনীতি করায় জাতীয় পার্টিকে এখন ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর’ বলছে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকারীরা। তাদের রোষানলে পড়ার শঙ্কায় প্রকাশ্যে দলীয় কোনো কর্মসূচি করতে পারছে না জাতীয় পার্টি। দুটি জনসভা করার ঘোষণা দিয়েও তা স্থগিত করতে হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সংস্কার ও জাতীয় ঐক্য তৈরিতে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দুই দফার সংলাপেও দাওয়াত পায়নি দলটি। এমনকি নভেম্বর মাসে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা ভাংচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
সংস্কারের ডামাডোল
অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দাবি মেনে রাষ্ট্র সংস্কারে হাত দেয়। সেই লক্ষ্যে গঠন করে ১১টি সংস্কার কমিশন। সেই সঙ্গে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ও সার্বিক অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি করা হয়।
৩ অক্টোবর গঠন করা হয় নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। ৬ অক্টোবর গঠন করা হয় সংবিধান সংস্কার কমিশন।
ছয় কমিশনের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেওয়ার কথা রয়েছে বছরের শেষভাগে বা জানুয়ারির শুরুতে। সে হিসাবে ২ জানুয়ারি শেষ হতে যাচ্ছে ৯০ দিন।
১৮ নভেম্বর গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম, নারী বিষয়ক ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। প্রতিবেদন দিতে ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগ পর্যন্ত সময় পাচ্ছে তারা।
সব কাজ গুছিয়ে সুপারিশ জমা দেওয়ার জন্য ৯০ দিন ‘স্বল্প সময়’ বলে মনে করছেন কমিশন প্রধানদের কেউ কেউ। তবে তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন তুলে দিতে আশাবাদী।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দেয়ালে আঁকা প্রতিবাদী চিত্রে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি
রাষ্ট্র সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে শুরুতে গঠিত ছয় সংস্কার কমিশনের প্রধানদের সঙ্গে ৪ নভেম্বর বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
ইতোমধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাছে একগুচ্ছ প্রস্তাব জমা পড়েছে। সেসব বাস্তবায়নের জন্যে সংবিধান সংশোধনের দরকার হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, নির্বাচনী আইনের সংস্কাসহ নানা প্রস্তাব জোর আলোচনায় রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির হাল হকিকত নিয়ে তৈরি করা শ্বেতপত্র ১ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে এ সংক্রান্ত কমিটি। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে উন্নয়ন বাজেটের ৪০ শতাংশ অর্থ ‘তছরুপ’ বা ‘লুটপাট’ হয়েছে বলে কমিটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
১৪ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দেয় গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ‘গুমের নির্দেশদাতা’ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয় সেখানে। ‘গুমের’ ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু এবং র্যাব বিলুপ্তিরও সুপারিশ করেছে এ কমিশন।
‘বন্ধু’ থেকে বৈরী
গণআন্দোলন ও জনরোষের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই দুই দেশের দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উল্টে যায়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে গত চার মাসে সেই টানাপড়েন জটিল চেহারা নিয়েছে।
হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ যেমন আছে, দুই দেশের পাল্টা পাল্টি বক্তব্য বিনিময়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও তপ্ত হয়ে উঠেছে।
সরকার বদলের সময় থেকেই বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া একরকম বন্ধ করে রেখেছে ভারত। তাতে বেনাপোলসহ সীমান্ত অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভুগছেন কলকাতার ব্যবসায়ী, হোটেল আর হাসপাতাল মালিকরাও। দুই দেশের জনগণের মধ্যে চলাচল এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের প্র



